আশ্বাসের প্রলোভন, শারীরিক শোষণের পর গর্ভধারণ—সবশেষে সামাজিক সালিশে কাবিন সম্পাদন হতেই উধাও ধূর্ত দেবর। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার দোড়া ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের পশ্চিমপাড়ায় ঘটেছে এই মর্মান্তিক ও ন্যক্কারজনক ঘটনা।
স্বামীর অকালমৃত্যুর পর সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে শ্বশুরবাড়িতে থেকে যাওয়া এক অসহায় নারী আজ প্রতারণা ও সামাজিক নিষ্ঠুরতার শিকার। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর অভিযুক্ত দেবর মোঃ সোহাগ হোসেন (৩২) আত্মগোপনে চলে গেলেও ক্ষোভে ফুঁসে উঠছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২০ বছর পূর্বে কোটচাঁদপুরের কুশনা ইউনিয়নের হরিন্দীয়া গ্রামের আতিয়ার রহমানের কন্যা ফেরদৌসী বেগমের সাথে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিবাহ হয় দোড়া ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের সাদের আলীর ছেলে মনজুরুল হকের। দীর্ঘ ১৬ বছরের দাম্পত্য জীবনে তাদের ঘর আলো করে আসে পুত্রসন্তান ওমর ফারুক (১৩)। তবে এক নির্মম দুর্ঘটনায় (গাছ থেকে পড়ে) স্বামী মনজুরুল হকের অকালমৃত্যু ঘটে।
পিতা হারিয়ে এতিম হয়ে পড়া একমাত্র সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ফেরদৌসী বেগম শ্বশুরবাড়িতেই অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেই আশ্রয়ই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। অভিযোগ উঠেছে, স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে ছোট দেবর সোহাগ হোসেনের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে বড় ভাবির ওপর। বিয়ের প্রলোভন ও জোরপূর্বক শারীরিক সখ্যতার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘ দিন যাবত ভাবিকে শোষণের জালে আটকে রাখে সোহাগ।
একপর্যায়ে ফেরদৌসী বেগম অন্তর্বর্তীকালীন ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। ঘটনাটি প্রথমে নিজের বোন জেসমিনকে জানালে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে দুই পরিবারে।
ভুক্তভোগী ফেরদৌসী বেগম আজ (২৪ জুলাই) সকাল ১১টায় এক বিশেষ অনুসন্ধানী সাক্ষাৎকারে বলেন:
”আমার স্বামীর অকালমৃত্যুর পর ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি এই বাড়িতেই থেকে গিয়েছিলাম। কিন্তু দেবর সোহাগের লালসা ও বিয়ের মিথ্যে আশ্বাসে আমি সব হারিয়েছি। আমি যখন গর্ভবতী হই, তখন সোহাগ ও তার পরিবার গোপনে আমার পেটের সন্তান নষ্ট করার জন্য আমাকে কোটচাঁদপুরের একটি নার্সিংহোম এবং পরবর্তীতে ঝিনাইদহ সদরে নিয়ে যায়। কিন্তু আমি আমার গর্ভের সন্তানকে মেরে ফেলতে রাজি হইনি।”
সন্তান নষ্ট করতে ব্যর্থ হয়ে এবং ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয় ইউপি সদস্য ও পাড়া-মহল্লার মাতব্বরদের হস্তক্ষেপে গত ১৯ জুন ২০২৬ তারিখে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা দেনমোহরে সোহাগের সাথে ফেরদৌসীর পুনঃবিবাহ সম্পন্ন হয়। কিন্তু সমাজকে দেখানোর জন্য বিয়ের নাটকের পরদিনই
সকালে বাড়ি থেকে চম্পট দেয় অভিযুক্ত সোহাগ।
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত দেবর সোহাগ হোসেন আত্মগোপনে থাকায় এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ মেলায় তার কোনো বক্তব্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।
তবে বিষয়টি নিয়ে কোটচাঁদপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, এ বিষয়ে ভুক্তভোগী নারী বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। লিখিত অভিযোগ বা এজাহার প্রাপ্তিসাপেক্ষে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে, সুবিচারের আশায় ভুক্তভোগী ফেরদৌসী বেগম আসন্ন রবিবার ঝিনাইদহ বিজ্ঞ আদালতে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে’ মামলা দায়ের করবেন বলে সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করেছেন।
একজন অসহায় ও বিধবা নারীকে বিয়ের প্রলোভনে গর্ভবতী করে কাবিনের পর পালিয়ে যাওয়ার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র কোটচাঁদপুরজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় বইছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, একজন এতিম শিশুর মাতাকে এভাবে ধোঁকা দেওয়া এবং ভ্রূণ হত্যার চেষ্টা করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।
সচেতন নাগরিক সমাজ অবিলম্বে এই লম্পট ও প্রতারক দেবর সোহাগকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে অসহায় নারী ও তার গর্ভস্থ সন্তানের অধিকার ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় থানা পুলিশের আশু জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হচ্ছে।