অন্যদিকে সংখ্যালঘু রামকষ্ণ পরিবারের এমন ভালোবাসা মুগ্ধ হন এসপি মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম। কৃতজ্ঞতা জানাতেও দ্বিধা করেননি তিনি। আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। অপরদিকে এসপির এমন দায়িত্ব ও কৃতজ্ঞতাবোধ দেখে অনেকে করছেন প্রশংসা।

এসপি তারিকুল ইসলামা বলেন, দীর্ঘ দুই দশকের পুলিশি জীবনে আজকে এক বিশেষ ভালোবাসা প্রাপ্তি। একটি পঙ্গু পরিবারের ভালোবাসার সিক্ত হলো নওগাঁ জেলা পুলিশ।

তিনি ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে বলেন, চলতি বছরের গত ১ জুন ভুক্তভোগী রামকৃষ্ণ সরকার আমাকে মোবাইল ফোনে জানান গত ১০জুন সকালে কতিপয় দুষ্কৃতিকারী তার ছেলে রকিকে ডাবের পানির সাথে বিষ খাইয়ে পরিবারের আয়ের একমাত্র অবলম্বন অটোরিকশা ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে আমি ওই ব্যক্তিকে নওগাঁ সদর থানায় যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেই। এবং মামলা রেকর্ড করা হয়। একই সাথে দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালানোর জন্য সদর থানা এবং জেলা গোয়েন্দা শাখার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী টিম গঠন করা হয়।

এই টিম নওগাঁ শহরের আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি বিশ্লেষণ, সপ্তাহ যাবত ডাটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করা হয়। এরপর পার্শ্ববর্তী বগুড়া, জয়পুরহাট ও গাইবান্ধা জেলায় অভিযান চালিয়ে দুষ্কৃতিকারী অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়। সেই সাথে রামকৃষ্ণের হারানো ধন টমটম অটো রিক্সাটি উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে গত সপ্তাহে আদালতের নির্দেশে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রামকৃষ্ণের অটো রিক্সাটি তাকে ফেরত দেওয়া হয়।

অসুস্থ রামকৃষ্ণ সরকার তার ছেলে রকিকে কিনে দিয়েছিলেন একটি অটো রিকশা। নওগাঁ শহরে সেই অটো রিকশা চালিয়ে সংসারের হাল ধরেছিলেন রকি। উপার্জনকৃত টাকা দিয়ে রামকৃষ্ণের চিকিৎসা খরচসহ মোটামুটি চলছিল সংসার। কিন্তু ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে হারাতে হয় উপার্জনের একমাত্র সম্বল অটো রিকশাটি। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে, হতাশায় পড়ে যায় পুরো পরিবারটি।

তবে বেশিদিন চিন্তায় থাকতে হয়নি রামকৃষ্ণের পরিবারকে। খোদ জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের বিশেষ তদারকিতে উদ্ধার করা হয় ছিনতাইকৃত অটো রিকশাটি। রামকৃষ্ণের পরিবার ফিরে পায় তাদের হারানো সম্বল অটো রিকশা।

রামকৃষ্ণ সরকারের বাড়ি নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার দক্ষিণ লক্ষীপুর গ্রামে। অসুস্থ হওয়ায় ছেলে রকি অটোরিকশা নিয়ে নওগাঁ শহরে এসে চালাতো। আর যে উপার্জন হতো তা দিয়ে চলতো চিকিৎসাসহ সংসারের খরচ।

ছিনতাই হওয়া অটো আবার ফেরত পেয়ে রামকৃষ্ণের পুরো পরিবার খুশিতে আত্মহারা। সেই সাথে পুলিশ সুপার এবং জেলা পুলিশের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাতেও ভুলেননি ওই অসহায় পরিবারটি। তারই প্রেক্ষিতে সোমবার রামকৃষ্ণ সরকার ও তার মা, স্ত্রী এবং সন্তান রকি এবং ফিরে পাওয়া অটোসহ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এসেছে ফুল নিয়ে পুলিশ সুপারকে ধন্যবাদ, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য। রামকৃষ্ণ বেশ কয়েক বছর আগে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছিল, তারপর থেকে অসুস্থ, সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে পারে না। শরীরে ক্যাথেটার লাগানোই আছে, তাই আমাকে ফোন করে অটোতেই বসে ছিল রামকৃষ্ণ।

কিছুক্ষণ পর আমি নিজেই নেমে আসলাম। এবং নিচে নেমে আমি অনেকটা হতভাগ ও অবিভূত। ফেরত পাওয়া টমটম অটোরিকশাসহ পুরো পরিবার পুলিশ সুপারকে ভালোবাসায় সিক্ত করল, সেই সাথে নওগাঁ জেলা পুলিশকে ফুলেল শুভেচ্ছাসহ একরাশ ভালোবাসা জানাল।

তাই আত্মহারা রামকৃষ্ণ সরকারের পুরো পরিবারটি ফিরে পাওয়া সেই অটোরিক্সাসহ হাজির হন পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে। সঙ্গে নিয়ে আসেন একটি ফুলের তোড়া। সোমবার (৩আগষ্ট) পুরো পরিবারটি এসপির হাতে তুলে দেন সেই তোড়াটি। এদিকে এসপির সাথে দেখা করে ফুলেল শুভেচ্ছা দিতে পেরে চরম খুশি পরিবারটি। পুরো পরিবারটি হয়ে যান আবেগ-আপ্লুত।

পুলিশ সুপার হিসেবে আমিও তাদেরকে শুভেচ্ছা জানালাম। মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মনে হল নওগাঁ জেলা পুলিশের দায়িত্ব আরও এক ধাপ বেড়ে গেল। আমি তাদেরকে নওগাঁ জেলা পুলিশের জন্য দোয়া করতে বললাম। তার বৃদ্ধ মা আমার মাথায় হাত রেখে সে যেন সমগ্র নওগাঁ জেলা পুলিশকে আশীর্বাদ করলো। পুলিশ সুপার তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিল এভাবেই নওগাঁ জেলা পুলিশ আগামী দিনে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কাজ করে যাবে।##