দীর্ঘদিন অবহেলিত পড়ে থাকার পর অবশেষে মিলেছিল সরকারি বরাদ্দ। বুকভরা আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার কুশনা ইউনিয়নের ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। কিন্তু সেই আশার আলোতে যেন কুচকুচে কালো কয়লার ছাই ঢেলে দিল লাইসেন্সধারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। উপজেলার মামুনশিয়া আলীর মোড় (পশ্চিমপাড়া মসজিদের মোড়) হতে সালকোপা (শালকুপা) পর্যন্ত আনুমানিক আড়াই কিলোমিটার সরকারি রাস্তার উন্নয়ন কাজে চরম নিম্নমানের ইট, খোয়া ও বালুর পরিবর্তে মাটি ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকা নয়ছয়ের এক নগ্ন মহোৎসবে মেতে উঠেছে ঠিকাদার। অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আবির কনস্ট্রাকশন’-এর এই চরম অনিয়ম ও তথ্য গোপনের বিরুদ্ধে ফুসে উঠেছে স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
আজ বিকেলে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, রাস্তার কাজে যে ইট ও খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই সিডিউলভুক্ত বা মানসম্মত নয়। স্থানীয়দের ভাষায়— এগুলো ইট নয়, যেন পোড়ামাটি। শুধু তাই নয়, নিয়মানুযায়ী কাজের শুরুতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা, প্রাক্কলিত ব্যয় এবং প্রকল্পের যাবতীয় তথ্য সম্বলিত সাইনবোর্ড বা পরিচিতি বোর্ড দৃশ্যমান স্থানে টাঙানোর আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও, এখানে তার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফলে কাজের প্রকৃত বরাদ্দ ও ঠিকাদার সম্পর্কে অন্ধকারে রয়েছেন এলাকাবাসী।
আজ বিকেলে সরেজমিনে সংবাদকর্মীরা যখন প্রকল্পের অনিয়ম ক্যামেরাবন্দী করছিলেন, তখন সেখানে তড়িঘড়ি করে উপস্থিত হন রাস্তার সাইট দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ম্যানেজার। তার কাছে যখন সরকারি সিডিউল উপেক্ষা করে এভাবে তিন নম্বর ও জঞ্জাল ইট এবং বালুর পরিবর্তে মাটি ব্যবহারের কারণ জানতে চাওয়া হয়, তখন তিনি আমতা আমতা করে বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না, ঠিকাদারের সাথে কথা বলেন।”
পরবর্তীতে সাংবাদিকদের তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখে এবং ঠিকাদারের সাথে যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বর চাওয়া হলে তিনি প্রথমে দিতে রাজি হলেও, গোপনে ফোনের ওপারে থাকা ব্যক্তির সাথে কথা বলে নম্বর দিতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর সাংবাদিকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোনো রকমে দায় এড়িয়ে তড়িঘড়ি করে স্পট থেকে সটকে পড়েন (পালিয়ে যান) ওই ম্যানেজার।
পরবর্তীতে অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আবির কনস্ট্রাকশন’-এর স্বত্বাধিকারীর সাথে যোগাযোগ করার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো অফিসিয়াল মোবাইল নম্বর না পাওয়ায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। সচেতন মহলের অভিযোগ, জবাবদিহিতা এড়াতেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি তাদের যোগাযোগের মাধ্যমগুলো আড়াল করে রেখেছে।
রাস্তা দিয়ে যাতায়াতকারী মামুনশিয়া গ্রামের ভুক্তভোগী বাসিন্দা মোঃ তুহিন হোসেন ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন:
“আমাদের এই রাস্তাটি বছরের পর বছর ধরে বেহাল দশায় পড়েছিল। অনেক দুর্ভোগের পর যখন শুনলাম সরকারি বাজেট এসেছে, তখন আমরা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু এখন এসে দেখি রাস্তার কাজে যে ইট ব্যবহার করা হচ্ছে, তা হাত দিলেই গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে! এটা চরম অন্যায়। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, এই পচা ইট তুলে ফেলে অনতিবিলম্বে এখানে এক নম্বর ইট দিয়ে কাজ করানো হোক।”
এলাকার সাধারণ মানুষ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও জানান, সরকার টেকসই রাস্তার জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা দিচ্ছে, অথচ ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টরা পোড়ামাটি ও নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করে সরকারি টাকা হরিলুট করছে। এভাবে রাস্তার পিচ ঢালাই করে চলে গেলে কিছুদিন পরই রাস্তাটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়বে এবং আলটিমেটলি এলাকার মানুষকে আবারও চরম ভোগান্তিতে পড়তে হবে। অবিলম্বে এই তড়িঘড়ি ও মানহীন কাজ বন্ধ করে ঠিকাদারের লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অনিয়মের এই মহাসমারোহের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আজ বিকেলে কোটচাঁদপুর উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) অফিসে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ফোনটি রিসিভ হয়নি। অফিসের এমন রহস্যজনক ও নীরব ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
তবে বিষয়টি নিয়ে একদমই ছাড় দিতে রাজি নয় স্থানীয় প্রশাসন। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপা রানী সরকার-কে জানানো হলে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
“সরকারি উন্নয়নমূলক কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। নিম্নমানের ইট বা সামগ্রী ব্যবহার করে সরকারি রাস্তা নির্মাণ করার কোনো সুযোগ নেই। আপনারা এ সংক্রান্ত সঠিক তথ্য ও প্রমাণ দিন। আমি এখনই বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। সিডিউল বহির্ভূত বা নিম্নমানের কোনো কাজ হলে তাৎক্ষণিক কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং উক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”সরকারি কোষাগারের টাকা জনগণের আমানত। আর সেই আমানত নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কোনো ঠিকাদারের নেই।
কোটচাঁদপুরের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে ‘আবির কনস্ট্রাকশন’ যে হরিলুটের রাজত্ব কায়েম করতে চাইছে, তা রুখে দিতে এবং সঠিক তদারকির মাধ্যমে টেকসই কাজ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের তাৎক্ষণিক ও কঠোর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, উদ্বোধনের আগেই ধসে পড়বে এই আড়াই কিলোমিটারের স্বপ্ন।