মহেশপুর উপজেলার আলামপুর কুলবাগান গ্রামের বাসিন্দা মো. শফিউল্লাহ বেপারী সৌদি আরবে পাঠানোর নামে প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারানোর অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। তার দাবি, বিদেশে ভালো চাকরি ও দুই বছরের বৈধ আকামা (ইকামা) করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে যশোরের শার্শা উপজেলার বসতপুর বড় কলোনির বাসিন্দা মো. দিলু মিয়া ও তার সৌদি প্রবাসী ছেলে মাসুদ ধাপে ধাপে তার কাছ থেকে প্রায় ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাকে বৈধভাবে বিদেশে পাঠানো বা আকামা করে দেওয়া হয়নি। বরং একের পর এক জাল কাগজপত্র, অর্থ আদায় এবং নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ভুক্তভোগী শফিউল্লাহ জানান, ২০২৩ সালের শুরুতে দিলু মিয়া তাকে দ্রুত সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। প্রথমে মেডিকেল পরীক্ষার নামে ৩৫ হাজার টাকা নেওয়া হয় এবং একটি মেডিকেল কার্ড তৈরি করে দেওয়া হয়। পরে তিনি ওই কাগজপত্র বাংলাদেশ দূতাবাসে জমা দিলে কর্তৃপক্ষ সেটিকে জাল মেডিকেল কার্ড হিসেবে শনাক্ত করে। এতে তার ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায় এবং পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়। এরপর নতুন করে মেডিকেল রিপোর্ট করিয়ে দেওয়ার কথা বলে আরও ৩৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, শুধু মেডিকেল খাতেই নয়, বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৪ লাখ টাকা এবং নগদে আরও ৩ লাখ টাকা দিলু মিয়া গ্রহণ করেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৭ লাখ টাকা দেওয়ার পরও কোনো বৈধ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়নি। বিদেশে পাঠানোর নামে সময়ক্ষেপণ এবং নানা অজুহাতে তাকে ঘুরানো হয়েছে।
ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, এ বিপুল পরিমাণ অর্থের ব্যবস্থা করতে তিনি ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ৮ লাখ টাকা ঋণ নেন। পরে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। এমনকি ঋণসংক্রান্ত জটিলতায় তাকে চার দিন কারাভোগও করতে হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এতে তার পরিবার আর্থিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
শফিউল্লাহ আরও অভিযোগ করেন, দিলু মিয়া ও তার ছেলে মাসুদ দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে লোক পাঠানোর নামে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে আসছেন। তারা বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে, সৌদি আরবে অবস্থানকালে তিনি আরও একটি ভয়াবহ ঘটনার শিকার হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন। তার দাবি, ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর রাতে রিয়াদের সুয়াদি এলাকা থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। দুই দিন আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এ সময় তার কাছে থাকা ২০ হাজার সৌদি রিয়াল, দুটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশে থাকা স্বজনদের কাছে ফোন করে মুক্তিপণের টাকা দাবি করা হয়। প্রাণনাশের হুমকির মুখে স্বজনরা ইসলামী ব্যাংকের দুটি হিসাবে মোট ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং বিকাশের মাধ্যমে আরও ৫০ হাজার টাকা পাঠান। সব মিলিয়ে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা আদায়ের পর অপহরণকারীরা তাকে হাত-পা বেঁধে মরুভূমিতে ফেলে রেখে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মুক্ত হওয়ার পর তিনি চিকিৎসা গ্রহণ করেন এবং সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পাশাপাশি দেশে ফিরে প্রতারণার ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। মামলায় প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, বিশ্বাসভঙ্গ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার সঙ্গে ব্যাংক লেনদেনের কাগজপত্র, টাকা জমার রসিদ, দূতাবাসে দেওয়া অভিযোগ, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
ভুক্তভোগী শফিউল্লাহ বলেন, বিদেশে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু প্রতারণার কারণে তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। ব্যাংক ঋণের বোঝা, ধারদেনা এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে তার পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। তিনি এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তার আর্থিক ক্ষতির প্রতিকার নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।