ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার টাঙান নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে দেখা দিয়েছে নদীভাঙনের শঙ্কা। বিশেষ করে উপজেলার মসলন্দপুর গ্রামে নদীর তীব্র স্রোতে কয়েকটি স্থানে পাড় ধসে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে অন্তত দুই শতাধিক পরিবার বসতভিটা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। একই সঙ্গে উপজেলার সাগুনী শালবন সংলগ্ন নদীশাসন প্রকল্পের বাইরে থাকা অংশে শুরু হওয়া ভাঙন সংরক্ষিত বনভূমি ও কৃষিজমির জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে টাঙান নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। পানির প্রবল স্রোতে মসলন্দপুর গ্রামের বিভিন্ন স্থানে নদীর পাড় ভেঙে কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। নদীর কিনারায় থাকা অনেক বসতবাড়ি এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দিন-রাত আতঙ্কে সময় কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।

মসলন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “প্রতিদিন একটু একটু করে নদী আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। কয়েকদিনের ব্যবধানে অনেক জমি নদীতে চলে গেছে। এখন বাড়িটাও ঝুঁকির মধ্যে। রাতে ঘুমাতে পারি না, কখন আবার পাড় ভেঙে যায় সেই ভয় কাজ করে।”

একই গ্রামের গৃহবধূ রাশিদা বেগম বলেন, “আমাদের সবকিছু এই বাড়িকে ঘিরেই। নদী যদি আর একটু এগিয়ে আসে, তাহলে কোথায় যাব জানি না। ছোট ছোট সন্তান নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিক, এটাই আমাদের দাবি।”

স্থানীয় কৃষক মো. সাইদুল ইসলাম জানান, নদীভাঙনের কারণে ইতোমধ্যে কয়েক বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। তিনি বলেন, “এখানে ধান, ভুট্টা ও বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়। জমি হারালে শুধু বাড়িঘর নয়, মানুষের জীবিকাও হুমকির মুখে পড়বে।”

অন্যদিকে উপজেলার সাগুনী শালবন সংলগ্ন টাঙান নদীর একটি অংশে আগে বাস্তবায়িত নদীশাসন প্রকল্পের কারণে সেই অংশ আপাতত নিরাপদ রয়েছে। তবে প্রকল্পের সীমার বাইরে থাকা অংশে তীব্র ভাঙন শুরু হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, ভাঙন এভাবে চলতে থাকলে সংরক্ষিত শালবনের বড় একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় পরিবেশ সচেতন ব্যক্তি অরুণ কুমার রায় বলেন, “সাগুনী শালবন শুধু পীরগঞ্জ নয়, পুরো জেলার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। নদীশাসন প্রকল্প যেখানে হয়েছে সেখানে সমস্যা কমেছে, কিন্তু পাশের অংশে ভাঙন ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। দ্রুত পুরো এলাকাকে নদীশাসনের আওতায় না আনলে বন রক্ষা করা কঠিন হবে।”

এলাকার বাসিন্দারা জানান, অতীতেও বর্ষা মৌসুমে টাঙান নদীর ভাঙনে বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অনেক পরিবার আগের ভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিলেও নতুন করে আবারও ভাঙনের শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।

মসলন্দপুরের এক জনপ্রতিনিধি বলেন, “নদীভাঙনের বিষয়টি আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানিয়েছি। জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা ও স্থায়ী নদীশাসনের ব্যবস্থা প্রয়োজন। অন্যথায় কয়েকশ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

পীরগঞ্জ উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী বলেন, “টাঙান নদীর পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ভাঙনের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “নদীভাঙনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বিষয়ে প্রশাসন অবগত রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে স্থায়ী সমাধানের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

স্থানীয়দের দাবি, শুধু অস্থায়ী প্রতিরোধ নয়, টাঙান নদীর ঝুঁকিপূর্ণ পুরো অংশে পরিকল্পিত ও টেকসই নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে সাগুনী শালবন রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধমূলক কাজ শুরু করা প্রয়োজন। অন্যথায় একদিকে যেমন দুই শতাধিক পরিবার গৃহহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে, অন্যদিকে হারিয়ে যেতে পারে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনভূমির একটি অংশও। বর্ষার শুরুতেই নদীর এমন ভয়াল রূপ স্থানীয় মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপই পারে এই জনপদ, কৃষিজমি এবং শালবনকে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে।