খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্নিয়া ইউনিয়নের টিপনা গ্রামে মাচা পদ্ধতিতে পোল্লার (চিচিঙ্গা) বাণিজ্যিক চাষ করে এলাকায় তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সফল চাষী শেখ শাহিনুর রহমান। তিনি ওই গ্রামের মৃত শেখ সামছুর রহমানের ছেলে। তার এই অভাবনীয় সাফল্য ও লাভজনক চাষ পদ্ধতি দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে একই এলাকার আব্দুল ওয়াদুদ সরদারসহ অনেক কৃষকই এখন মাচায় সবজি চাষে ঝুঁকছেন এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

ডুমুরিয়ার এই কৃষি বিপ্লবের মাঠ পর্যায়ের চিত্র, কৃষকের অভিজ্ঞতা এবং কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে তৈরি একটি বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন:

পোল্লা চাষী শেখ শাহিনুর রহমান বলেন:

“প্রথমে যখন মাচা পদ্ধতিতে পোল্লার চাষ শুরু করি, তখন অনেকেই নানা কথা বলেছিল। কিন্তু আমি দমে যাইনি। কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরামর্শে সঠিক নিয়মে সার ও বালাইনাশক ব্যবহার করেছি। মাটিতে চাষ করার চেয়ে মাচায় ফলন অনেক বেশি হয়েছে, সবজিগুলো দেখতেও চমৎকার ও দাগহীন হয়েছে। বাজারে এর ভালো দাম পাচ্ছি। আমার দেখাদেখি আব্দুল ওয়াদুদ ভাইসহ এলাকার অনেকেই এখন এই চাষে আসছেন, এটা দেখে খুব ভালো লাগছে। সরকারি সহযোগিতা ও সঠিক পরামর্শ পেলে আমাদের এলাকার কৃষকরা আরও এগিয়ে যাবে।”

উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নূরুন নাহার বলেন:

“শেখ শাহিনুর রহমান একজন অত্যন্ত উদ্যমী ও প্রগতিশীল চাষী। টিপনা ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে আমি শুরু থেকেই তার এই মাচা পদ্ধতির চাষ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। মাঠ পরিদর্শনে গিয়ে তাকে সুষম সার প্রয়োগ, আধুনিক মালচিং পেপারের ব্যবহার এবং রোগবালাই দমনে কারিগরি দিকনির্দেশনা দিয়েছি। তার এই অভূতপূর্ব সাফল্য দেখে ব্লকের অন্য কৃষকদের মধ্যেও আধুনিক ও লাভজনক পদ্ধতিতে সবজি চাষের আগ্রহ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।”

ডুমুরিয়া উপজেলা এসএপিপিও (সাব-আ্যাসিস্ট্যান্ট প্ল্যান্ট প্রটেকশন অফিসার) মোঃ আলী হাসান বলেন:

“মাচা পদ্ধতিতে সবজি চাষের প্রধান সুবিধা হলো এতে রোগবালাই ও ক্ষতিকারক পোকার আক্রমণ অনেক কম হয়। মাটিতে সবজি থাকলে বর্ষার পানি বা অতিরিক্ত আর্দ্রতায় ছত্রাকজনিত রোগে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে, কিন্তু মাচায় পোল্লা ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে বলে গুণগত মান ঠিক থাকে। আমরা শেখ শাহিনুর ও আব্দুল ওয়াদুদসহ স্থানীয় চাষীদের পরিবেশবান্ধব সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM) কৌশল ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করেছি, যার ফলে তারা সম্পূর্ণ নিরাপদ সবজি উৎপাদন করতে পারছেন।”

ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মোঃ নাজমুল হুদা বলেন:

“ডুমুরিয়া উপজেলা সবজি ভাণ্ডার হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত। শেখ শাহিনুর রহমানের মাচা পদ্ধতিতে ঝিঙে ও পোল্লার এই চাষ আমাদের সবজি উৎপাদনের সুনামকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। সনাতন পদ্ধতির চেয়ে মাচা পদ্ধতিতে একর প্রতি ফলন প্রায় দেড় থেকে দ্বিগুণ বেশি পাওয়া সম্ভব। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে আমরা চাষীদের আধুনিক উচ্চফলনশীল বীজ, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং সব ধরনের লজিস্টিক সহায়তা দিয়ে আসছি। কৃষকদের এই বাণিজ্যিক রূপান্তর ডুমুরিয়ার গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।”

খুলনা জেলা কৃষি কর্মকর্তা (উপ-পরিচালক, ডিএই) মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন:

“খুলনা জেলায় আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষির যে রূপান্তর ঘটছে, ডুমুরিয়ার টিপনা গ্রাম তার একটি অনন্য উদাহরণ। কৃষক শেখ শাহিনুর রহমান যে তাক লাগানো সাফল্য দেখিয়েছেন, তা পুরো জেলার চাষীদের জন্য একটি দারুণ অনুপ্রেরণা। মাচায় উৎপাদিত পোল্লা ও ঝিঙের বাজারমূল্য ও চাহিদা দুটোই সবসময় বেশি থাকে। আমরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ডুমুরিয়ার এই সফল মডেলকে পুরো খুলনা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছি, যাতে আমাদের কৃষকরা কম খরচে অধিক লাভ নিশ্চিত করতে পারেন।”

টিপনা গ্রামের এই কৃষি বিপ্লব পর্যালোচনায় দেখা যায়, শেখ শাহিনুর রহমানের সাফল্যের পেছনে মূলত তিনটি বিষয় কাজ করেছে:

প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার: মাটিতে চাষ না করে মাচা ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির মেলবন্ধন।

নিরাপদ সবজি উৎপাদন: বিষমুক্ত উপায়ে ফেরোমন ফাঁদ ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে গুণগত মান উন্নয়ন।

সমন্বিত কৃষি সেবা: মাঠ পর্যায়ের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি ও শতভাগ দিকনির্দেশনা।

ডুমুরিয়ার টিপনা গ্রামের শেখ শাহিনুর রহমান প্রমাণ করেছেন যে—সঠিক প্রযুক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং কৃষি বিভাগের সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন সম্ভব। তার এই ঝিঙে ও পোল্লার চাষের মডেল বাংলাদেশের সামগ্রিক কৃষি উন্নয়নে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।