
সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী তাহিরপুরের যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল দরপত্রের (টেন্ডার) মাধ্যমে সীমানা নির্ধারণ করে ১০৭ কোটি টাকায় ইজারা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। ইজারা পেয়েছেন শাহ রুবেল ও নাছির মিয়া। শর্তানুযায়ী, নির্ধারিত সীমানার ভেতরে কোনো প্রকার ড্রেজার বা ‘বোমা মেশিন’ ছাড়া সনাতন পদ্ধতিতে স্থানীয় শ্রমিকদের দ্বারা বালু ও পাথর উত্তোলন করতে হবে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, দেশখ্যাত ঐতিহ্যবাহী শিমুল বাগান সংরক্ষণ এবং সীমান্ত নদী যাদুকাটার পাড় কাটা রোধে এবার নজিরবিহীন ও কঠোর অবস্থান নিয়েছে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও বিজিবি। তাদের নির্দেশনার আলোকেই ইজারাদাররা শিমুল বাগান ও নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো রক্ষায় বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড বা বেড়া তৈরির কাজ শুরু করেছেন। সরকারি নিয়মনীতি মেনে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি, ইজারা বহির্ভূত এলাকা রক্ষায় এবার মাঠে নেমেছে ইজারাদার কর্তৃপক্ষ। নদী তীরবর্তী জনপদে এখন দৃশ্যমান নানামুখী জোরালো পদক্ষেপ; টানানো হয়েছে লাল সতর্কবার্তা।
তবে এই মহৎ উদ্যোগের নেপথ্যে লুকিয়ে আছে একটি স্থানীয় ভূমিখেকো প্রভাবশালী নদী পাড় কাটা সিন্ডিকেটের অন্ধকার অধ্যায়। যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এশিয়ার বিখ্যাত শিমুল বাগানের পাশ থেকে শুরু করে নদী তীরবর্তী গ্রামগুলোর পাড় কেটে আসছিল। ফলে শিমুল বাগান ও গ্রামগুলো এখন চরম হুমকির মুখে। এই চক্রটি রাতের আঁধারে একাধিক বোমা ও ড্রেজার মেশিন লাগিয়ে অবৈধভাবে একের পর এক গ্রামের পাড় কেটে কোটি কোটি টাকার বালু ও পাথর লুট করে নিলেও এতদিন তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তারা এতই প্রভাবশালী যে, গ্রামের নিরীহ মানুষের ঘরবাড়ি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে পড়লেও ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চক্রটি রাতের আঁধারে নিষিদ্ধ ড্রেজার ব্যবহার করে নদীর তলদেশ ও পাড় কাটত, আর এই অপরাধের দায় বারবার চাপানোর অপচেষ্টা করা হতো সাধারণ সনাতন (ম্যানুয়াল) পদ্ধতির শ্রমিক ও বৈধ ইজারাদারের ওপর। স্থানীয় বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্যও রাতের আঁধারে অবৈধ উপায়ে বালু কেটে প্রায় চার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে সিলেট শহরে অট্টালিকা বানিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নদীতে সনাতন পদ্ধতিতে কর্মরত বালু শ্রমিক মো. রমজান আলী, বাসু মিয়া ও মো. একলাস নূর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ইজারাদারের নির্ধারিত সীমানায় থেকে হাত দিয়ে, সেউতি দিয়ে বালু তুলে কোনোমতে পেটের ভাত জোগাড় করি। কিন্তু কিছু অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ী রাতের অন্ধকারে নদীর পাড় কেটে নিজের আখের গোছাচ্ছে, আর বদনাম হচ্ছে আমাদের ও ইজারাদারের। এই দানবীয় ড্রেজারের কারণে নদী ও শিমুল বাগান ধসে যাচ্ছে। আমাদের কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যারা ড্রেজার চালিয়ে নদী ধ্বংস করছে, তাদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।”
এবার প্রকৃত অপরাধী ও অবৈধ বালু খেকোদের রুখতে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ইজারাদার কর্তৃপক্ষ। সরেজমিনে যাদুকাটা ১ ও ২ নম্বর মহালে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে বালু উত্তোলন ও পাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইজারাদারের পক্ষ থেকে বাঁশ দিয়ে নদীর পাড় এলাকায় শক্তিশালী ‘আড়ি’ বা বেড়া দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো নৌকা বা ড্রেজার পাড়ের কাছে ঘেঁষতে না পারে।
এ ব্যাপারে ইজারাদার প্রতিনিধি মো. লোকমান মিয়া ও সাজ্জাদ মিয়া জানান, যাদুকাটা নদী সরকারি নিয়মানুযায়ী ইজারা হয়েছে এবং এখান থেকে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করে জীবিকানির্বাহ করছেন। কিন্তু কিছু দুষ্কৃতিকারী রাতের আঁধারে সীমানার বাইরে গিয়ে শিমুল বাগান ও ঘাগটিয়ার পাড় কেটে নিয়ে যাচ্ছে। ইজারাদারের পক্ষ থেকে বহুবার তাদের বাধা দেওয়া হয়েছে।
যাদুকাটা ১ ও ২-এর ইজারাদার শাহ্ রুবেল তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, “শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও পরিবেশ রক্ষার জন্য আমরা সরকারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব দিয়ে নিয়ম মেনে মহাল ইজারা নিয়েছি। কিন্তু স্থানীয় একটি চিহ্নিত প্রভাবশালী চক্র আমাদের ব্যবসার ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এবং শিমুল বাগান ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে। আমরা স্পষ্ট করে দিতে চাই, বৈধ সীমানার বাইরে এক ইঞ্চি জায়গাও কাউকে ছুঁতে দেওয়া হবে না। আমরা নিজেদের খরচে নদীর পাড়ে বাঁশের বেড়া দিচ্ছি এবং নিজস্ব পাহারাদার বসিয়েছি। এর আগে জেলা প্রশাসক বরাবর আমরা রাতের আঁধারে নদীর পাড় কাটা বালু চোরদের বিরুদ্ধে ৮-১০টি লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি, যেন রাতের ড্রেজার চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
তবে আইনের একটি বড় ফাঁক এই অপরাধীদের বারবার পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে বলে জানান জেলার শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা। সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন (পিপিএম) বলেন, “যাদুকাটা বালুমহালটি জেলা প্রশাসন থেকে ইজারা দেওয়া হয়। নদীর তীর কাটা ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে আমরা প্রতিনিয়ত মামলা দিচ্ছি। গত জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত আমরা ৬৬টি মামলা দিয়েছি, যার মধ্যে এজাহারভুক্ত ও এজাহার বহির্ভূত সবমিলিয়ে ৭২০ জন আসামি এবং গ্রেফতার করা হয়েছে ৬০ জনকে। কিন্তু মূল সমস্যা হলো, ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ (সংশোধনী ২০২৩)’ অনুযায়ী এই অপরাধটি জামিনযোগ্য। ফলে আসামিরা দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসে এবং জব্দকৃত নৌযান নিয়ে আবারও একই অপরাধে লিপ্ত হয়।”
তিনি আরও যোগ করেন, “টাস্কফোর্স ও মোবাইল কোর্টকে আরও কার্যকর করতে পারলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে অবৈধ নৌযানগুলো স্পটেই ধ্বংস করে দিতে পারব, তখন অপরাধীরা বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। আর ইজারাদাররা নদীর পাড়ে বেড়া দিয়ে যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ইজারাদাররা যদি রাতে বালু কাটা সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে কেবল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কাজ পরিচালনা করেন, তবে এই মহালে দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।”
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, “যাদুকাটা নদী শুধু একটি বালুমহাল নয়, এটি আমাদের পরিবেশগত সম্পদ ও শিমুল বাগানের মতো বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্রের প্রাণ। অবৈধভাবে কেউ যেন নদীর পাড় কাটতে না পারে, সেজন্য জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বদা সতর্ক আছে। প্রতিনিয়ত মোবাইল কোর্ট ও মামলা হচ্ছে। যৌথভাবে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি টহল জোরদার করা হয়েছে। তবে আইনের প্রয়োগ ও প্রশাসনের অভিযানের পাশাপাশি প্রথম প্রতিরোধটা আসতে হবে স্থানীয়দের কাছ থেকে।” তিনি আরও জানান, পরিবেশ ধ্বংসকারী যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসন শতভাগ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অটল।
ইজারাদারের বাঁশের ব্যারিকেড এবং প্রশাসনের এই কঠোর হুংকার যদি মাঠপর্যায়ে শতভাগ বাস্তবায়িত হয়, তবেই বাঁচবে যাদুকাটা নদী, রক্ষা পাবে অপরূপ শিমুল বাগান। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, এখন দেখার বিষয় প্রশাসনের এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রভাবশালী বালু খেকো সিন্ডিকেটের খুঁটির জোরকে উপড়ে ফেলতে কতটা সফল হয়।
Leave a Reply