
সামাজিক বা ধর্মীয় বন্ধন নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ও লাভজনক ব্যবসা! আর সেই ব্যবসার মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে দেশের সংবেদনশীল ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’। এমনই এক চাঞ্চল্যকর ও গা শিউরে ওঠা অভিযোগ উঠেছে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের মৌমিতা আফরিন (২১) নামের এক তরুণীর বিরুদ্ধে। একের পর এক বিয়ে করা, স্বামীদের জিম্মি করে অর্থ আদায় এবং পরবর্তীতে সাজানো গল্পে মামলা ঠুকে দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়াকেই মৌমিতা ও তার চক্রটি স্থায়ী পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।
সম্প্রতি ঝিনাইদহের বিজ্ঞ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা একটি মামলার সূত্র ধরে এই চক্রের ভয়ঙ্কর ব্ল্যাকমেইলিং ও ‘মামলা-বাণিজ্যের’ থলের বিড়াল জনসম্মুখে আসতে শুরু করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে ঝিনাইদহ ট্রাইব্যুনালে একটি পিটিশন মামলা (নম্বর: ৫১/২৬) দায়ের করেন কোটচাঁদপুর বেনেপাড়ার আবু সালামের কন্যা মৌমিতা আফরিন। মামলায় রামচন্দ্রপুর গ্রামের মো: লিখন (১৮) সহ ৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১/২ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার অভিযোগে দাবি করা হয়েছে— গত ১৭ মে ২০২৬ তারিখে মৌমিতাকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে মুখ চেপে অপহরণ করে নির্জন স্থানে নিয়ে ৭ দিন আটকে রেখে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়েছে।
তবে মামলার খুঁটিনাটি, ঘটনার তারিখ এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে পুরো ঘটনাটিকেই একটি সাজানো নাটক এবং মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুপরিকল্পিত ফাঁদ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও আইন বিশেষজ্ঞরা।
অনুসন্ধানের গভীরে গিয়ে মৌমিতার একের পর এক বিয়ের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। দেনমোহর আদায় ও স্বামীদের নিঃস্ব করাই যেন এই তরুণীর মূল লক্ষ্য:
প্রথম স্বামী (সোহাগ হোসেন): গত ২৯/০১/২০২৪ ইং তারিখে দুধসরা গ্রামের মোঃ গোলাম রসুলের পুত্র মোঃ সোহাগ হোসেনের সাথে ১ লাখ টাকা কাবিনে মৌমিতার প্রথম বিয়ে হয়। কিছুদিন পরেই শুরু হয় পারিবারিক কলহ এবং পরবর্তীতে ‘খোলা তালাকের’ মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা আদায় করে ওই মধ্যবিত্ত পরিবারটিকে নিঃস্ব করে বিদায় নেয় মৌমিতা।
দ্বিতীয় স্বামী (মিন্টু রহমান): প্রথম সংসারের পর গত ০৭/০৭/২০২৪ তারিখে ১ লাখ ১৫ হাজার ১ টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয় মোঃ মিন্টু রহমানের (পিতা: কওছার আলী) সাথে। এই সংসারে থাকাকালীনই মৌমিতা তার নতুন শিকারের খোঁজ শুরু করে। অবশেষে গত ১৯/০৫/২০২৬ তারিখে বিভিন্ন কাল্পনিক অপবাদ দিয়ে মিন্টুকে ডিভোর্স দেয় মৌমিতা।
তৃতীয় স্বামী (লিখন হোসেন): দ্বিতীয় স্বামীর ঘরে থাকাকালীনই রামচন্দ্রপুর (আরজি অনুযায়ী রামচন্দ্রপুর) গ্রামের জুমান আলীর ছেলে মোঃ লিখন হোসেনের (১৮) সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে মৌমিতা। গত ১৭/০৫/২০২৬ তারিখে ঝিনাইদহ জেলা নোটারী পাবলিকের কার্যালয়ে ১ লাখ ১ টাকা দেনমোহরে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু বিয়ের পরেই মৌমিতার রূপ বুঝতে পেরে বনিবনা না হওয়ায় গত ০৭/০৬/২০২৬ তারিখে লিখন তাকে তালাক প্রদান করেন।
ভুক্তভোগী যুবক লিখন হোসেন গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে মৌমিতার পাতা ফাঁদের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান,
”মৌমিতা আমাকে প্রেমের জালে ফেলে বলে— ‘আজ তুমি আর আমি পালিয়ে যাবো, আমার বাবার অনেক সম্পত্তি আছে, সব তোমাকে দিবো।’ সে আমাকে প্রলোভন দেখিয়ে আমার ভাইয়ের মোটরসাইকেলটি বিক্রি করতে বাধ্য করে। তার কথামতো আমি মোটরসাইকেলটি নিয়ে গেলে কোটচাঁদপুরের ‘মা মটরস’-এর মালিক মোঃ সিরাজুল ইসলাম সেটি ৮০ হাজার টাকায় ক্রয় করেন। (পরবর্তীতে সিরাজুল ইসলাম ওই মোটরসাইকেলটি তালসার গ্রামের এক গ্রাহকের কাছে ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন)।”
লিখন আরও জানান, মোটরসাইকেল বিক্রির সেই মোটা অংকের টাকা নিয়ে তারা ঝিনাইদহে নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে করে খুলনা মংলা পোর্টে বেড়াতে যান। সেখানে একটি আবাসিক এলাকায় ৩ দিন অবস্থান করার পর, রাতের আঁধারে লিখন ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় মোটরসাইকেল বিক্রির ৫০ হাজার টাকা চুরি করে পালিয়ে বাপের বাড়ি চলে আসে মৌমিতা। আর বাপের বাড়ি ফিরেই সে লিখনের পরিবারকে সামাজিকভাবে ধ্বংস করতে ঝিনাইদহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে এই কাল্পনিক ‘ধর্ষণ ও অপহরণ’ মামলাটি দায়ের করে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মৌমিতার দায়ের করা মামলার আরজিতে গুরুতর অসংগতি রয়েছে। এজাহারে দাবি করা হয়েছে, ২৪ মে তাকে কালীগঞ্জ লাউতলা এলাকায় রাস্তায় ফেলে যাওয়া হয়। কিন্তু মামলা করতে প্রায় এক মাস সময় নেওয়া হয়েছে (১৬ জুন)। মামলার এই দীর্ঘ বিলম্বের পেছনে পুলিশের পরামর্শের কথা বলা হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল আসামিপক্ষের সাথে অর্থ আদায়ের দরকষাকষি ও সময়ক্ষেপণ মাত্র।
তাছাড়া, যে বেনেপাড়া এলাকা থেকে সকাল ১০টায় অপহরণের দাবি করা হয়েছে, সেটি অত্যন্ত জনবহুল। দিনের আলোতে একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে মুখ চেপে ধরে অপহরণের গল্পটি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে চরম অবিশ্বাস্য ও হাস্যকর ঠেকেছে।
এই সাজানো ও নাটকীয় মামলা থেকে রেহাই পেতে এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছে লিখনের পরিবার। লিখনের পিতা জুমান আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
”আমার ছেলে সরল মনে ওর প্রেমের ফাঁদে পড়েছিল। আজ আমাদের টাকাও গেল, আবার আমার ছেলের নামে মিথ্যা ধর্ষণের মামলা দিয়ে আমাদের সামাজিকভাবে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। আমরা এই ব্লাকমেইলিং চক্রের হাত থেকে বাঁচতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ চাই।”
অভিযোগের বিষয়ে মৌমিতা আফরিনের পিতা আবু সালামের নিকট জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, আইন আইনের গতিতে চলবে, তবে ঘটনার পেছনে পারিবারিক ও আইনি কিছু বিষয় রয়েছে যা আদালতে প্রমাণিত হবে।
এলাকাবাসীর দাবি, মৌমিতা ও তার পেছনে থাকা একটি স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহল এই মামলা-বাণিজ্যের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। এর আগেও এই চক্রটি একাধিক সহজ-সরল যুবকের জীবন ধ্বংস করেছে।
স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন তৈরি হয়েছে প্রকৃত ভুক্তভোগী নারীদের সুরক্ষার জন্য। কিন্তু মৌমিতার মতো পেশাদার প্রতারকরা যখন এই আইনকে ঢাল বানিয়ে নিরীহ পরিবার ধ্বংসের হাতিয়ার বানায়, তখন প্রকৃত ভুক্তভোগী নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ কঠিন হয়ে পড়ে। ঝিনাইদহের এই কথিত ‘মামলা-বাজ’ চক্রের বিরুদ্ধে এখনই সুষ্ঠু তদন্ত ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
Leave a Reply