
বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে শেষ দিন পর্যন্ত মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদকালটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে বঙ্গভবনে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন তিনি। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন মন্তব্যের জেরে শেষ পর্যন্ত তীব্র বিতর্ক ও রাজপথের আন্দোলনের মুখে তাঁকে দায়িত্ব ছেড়ে বিদায় নিতে হয়।
২০২৩ সালের এপ্রিলে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সাহাবুদ্দিন। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তাঁকে শপথ বাক্য পাঠ করান। দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুতেই তাঁর প্রাথমিক মনোযোগ ছিল সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশের অবস্থান তুলে ধরা।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রাতারাতি বদলে যায়। ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করলে, ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। পরবর্তীতে ৮ আগস্ট তিনি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে শপথ পাঠ করান।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মাথায় রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেন— সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের কোনো “দাপ্তরিক বা লিখিত প্রমাণ” তাঁর কাছে নেই। এই মন্তব্য প্রকাশের পরপরই সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ছাত্র-জনতা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একাধিক উপদেষ্টা ও সমন্বয়ক মো. সাহাবুদ্দিনের বক্তব্যকে “মিথ্যাচার” ও “সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল” বলে অভিহিত করেন। এই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পরই ঢাকার বঙ্গভবন ঘেরাওসহ দেশজুড়ে সর্বস্তরের মানুষ ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো রাষ্ট্রপতির তাৎক্ষণিক পদত্যাগের দাবি জানায়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন কি না—এ বিষয়ে বৈপরীত্যমূলক বক্তব্যের জেরে রাষ্ট্রপতির নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো এবং আন্দোলনকারী ছাত্র নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, রাজনৈতিক ও নৈতিক ভিত্তি হারানোর পর তিনি আর রাষ্ট্রপতির পদে বহাল থাকতে পারেন না। তীব্র গণদাবি, রাজনৈতিক সমঝোতা ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অবশেষে তাঁর পদত্যাগের পথ সুগম হয়।
বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবনে প্রবেশ করলেও, তাঁর মেয়াদকালের সমাপ্তি ছিল চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নাটকীয়তায় ভরা। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা ও সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রত্যাশা নিয়ে দায়িত্ব শুরু করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিদায় দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।
Leave a Reply