
আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ২০১০ সালের পর ফুটবল ইতিহাসের দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি নিজেদের করে নিল স্পেন। অন্যদিকে দীর্ঘ ৬০ বছর পর পুরুষ ফুটবল বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার যে অনন্য সুযোগ আর্জেন্টিনার সামনে এসেছিল, তা হাতছাড়া হলো।
অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের বদলি ফরোয়ার্ড ফেরান তোরেসের করা একমাত্র জয়সূচক গোলে শিরোপা থেকে বঞ্চিত হয় আলবিসেলেস্তেরা। ১-০ স্কোরলাইনে ম্যাচটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মনে হলেও পুরো ১২০ মিনিটের মাঠের লড়াইয়ে স্প্যানিশদের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। ফাইনালে আর্জেন্টিনার এই হারের পেছনে যে ৫টি প্রধান কারণ বড় ভূমিকা রেখেছে, তা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
শিরোপা নির্ধারণী এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের অন্যতম বড় কারণ ছিল অধিনায়ক লিওনেল মেসির ওপর দলের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। স্পেনের মাস্টারমাইন্ড কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে মেসিকে বোতলবন্দী করতে বিশেষ ছক কষেছিলেন। স্প্যানিশ মাঝমাঠের দুই তারকা রদ্রি এবং ফাবিয়ান রুইজ পুরো ম্যাচজুড়ে মেসিকে ছায়ার মতো কড়া পাহারায় (ম্যান-মার্কিং) রাখেন। ফলে মেসি মাঠে স্বাধীনভাবে খেলার কোনো সুযোগই পাননি এবং সতীর্থদের বল জোগান দিতে ব্যর্থ হন।
স্পেনের নিখুঁত ট্যাকটিক্সের কারণে ম্যাচের প্রথম ১৫ মিনিটে মেসি মাত্র একবার বল স্পর্শ করতে পেরেছিলেন। টুর্নামেন্টে ফাইনালের আগে ৮ গোল করা আর্জেন্টাইন জাদুকরের এই ম্যাচে প্রত্যাশিত গোলের মান (xG) ছিল মাত্র ০.০৪ এবং তিনি পুরো ম্যাচে একটিও ‘কী পাস’ দিতে পারেননি।
গোটা টুর্নামেন্টের মতো ফাইনালেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্পেনের মাঝমাঠের হাতে। তারা প্রতিপক্ষকে বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার তেমন কোনো সুযোগই দেয়নি। দ্রুতগতির ওয়ান-টাচ ফুটবল এবং নিখুঁত পাসিংয়ের সামনে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড কার্যত অসহায় আত্মসমর্পণ করে। রদ্রি ও পেদ্রিদের মতো ফুটবলাররা মাঝমাঠের দখল রাখায় আর্জেন্টিনা কাউন্টার অ্যাটাক বা পাল্টা আক্রমণ গড়ার কোনো সুযোগই তৈরি করতে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধের ইনজুরি টাইমের (৯০+৩ মিনিট) মাথায় পাও কুবারসিকে ফাউল করে বসেন এনজো ফার্নান্দেজ। এর আগে একটি হলুদ কার্ড পাওয়ায়, দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের মুখে পড়ে মাঠ ছাড়তে হয় আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের এই মূল কারিগরকে। ম্যাচের চরম মুহূর্তে এমন অপ্রয়োজনীয় ফাউল করে লাল কার্ড দেখাটা দলের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনে।
পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ১ গোল হজম করা শক্তিশালী স্পেনের বিরুদ্ধে ১০ জনের দল নিয়ে লড়াই করা আর্জেন্টিনার জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে এই সংখ্যাগত সুবিধার পুরো ফায়দা তোলে স্পেন এবং সঠিক পজিশনে থাকা ফেরান তোরেস জয়সূচক গোলটি করতে ভুল করেননি।
চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের মূল দেয়াল ছিল লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো জুটি। কিন্তু প্রথমার্ধেই হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে পড়ে মাঠ ছাড়েন লিসান্দ্রো। এরপর ডিফেন্সের আরেক স্তম্ভ রোমেরোও চোটের শিকার হলে কোচ লিওনেল স্কালোনির পুরো রক্ষণাত্মক কৌশল তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। এই দুই প্রধান ডিফেন্ডারের অনুপস্থিতি আর্জেন্টিনার ব্যাকলাইনকে দুর্বল করার পাশাপাশি পেছন থেকে বল সামনে বাড়িয়ে আক্রমণ গড়ার পথও রুদ্ধ করে দেয়।
ফাইনালের আগে টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ১৯টি গোল করেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু মহরণীয় এই ম্যাচে তাদের আক্রমণভাগ ছিল পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। কোচ স্কালোনি ফাইনালের মঞ্চে অতি-সাবধানী বা রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নিয়েছিলেন। গোল না খাওয়ার মানসিকতা থেকে ডিফেন্ডাররা অতিরিক্ত নিচে নেমে আসায় স্পেন আক্রমণের পর আক্রমণ করার সুযোগ পায়। এছাড়া অতিরিক্ত সময়ের আগেই স্কালোনির সব খেলোয়াড় বদলির (সাবস্টিটিউশন) কোটা শেষ হয়ে যাওয়ায়, শেষ মুহূর্তে নতুন কোনো আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় নামানোর উপায় ছিল না।
এই রক্ষণাত্মক কৌশলের কারণে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের পোস্টে একটি শটও নিতে পারেনি। পুরো ১২০ মিনিটে তারা মাত্র ২টি শট নেয়, যার একটিও অন-টার্গেট ছিল না। অন্যদিকে স্পেন ২০টি শট নেয়, যার মধ্যে ১২টিই ছিল লক্ষ্যে। পরিসংখ্যানে স্পষ্ট—স্পেনের প্রত্যাশিত গোল (xG) ছিল ১.৯৪, যেখানে আর্জেন্টিনার ছিল মাত্র ০.১৭। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে ফাইনালে কতটা একতরফা আধিপত্য বিস্তার করে জিতেছে স্পেন।
Leave a Reply