
চায়নাতে একটা ভয়াবহ ব্যাপার ঘটেছে। ক্রিসপার জিন থেরাপি নেবার পর একটা ৬ বছরের বাচ্চা মারা গিয়েছে। সেটা না হয় মানা গেল। এক্সপেরিমেন্টাল থেরাপি নিতে গিয়ে অনেকেই সার্ভাইভ করে না। কিন্তু ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে সে থেরাপি দেবার আগে এথিক্স এপ্রুভাল নেয়া হয়নি। এমনকি সেই একই থেরাপি ট্রায়াল দেয়া চারটি বানরের সবকটি ৪ সপ্তাহের মধ্যে সিরিয়াস লিভার ইনজুরি হয়েছিল এরপরেও সেটি সেই বাচ্চাকে দেয়া হয়েছে। আর সেই চিকিৎসার জন্য বাবা মা কত খরচ করেছে জানেন?
মাত্র ১০ কোটি টাকা!
এর চেয়েও ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে অথরিটি এই বাচ্চার মৃত্যুর খবর চেপে গিয়েছিল গত এক বছর এবং সেই সায়েন্টিস্ট ও তার দল সেই একই থেরাপির ডাটা বিখ্যাত “ন্যাচার” পত্রিকায় পাবলিশ করেছে যেখানে সেই বাচ্চার মৃত্যুর খবর কিংবা আগের সেই বানরের সেফটি ডাটা বেমালুম চেপে যাওয়া হয়েছে।
এবার বলি কি হয়েছে। গোপনীয়তার সুত্রে সেই বাচ্চাটির নাম দেয়া হয়েছে “মেই”।
মেই এর বাবা মা লক্ষ্য করল মেই পড়াশোনায় অন্যদের তুলনায় একটু স্লো। ডাক্তার দেখানোর পর ধরা পড়ে যে মেই এর নিউরনে সিএইচডি৩ জিনে একটি বিরল মিউটেশন আছে এবংএ ধরনের মিউটেশনজনিত রোগটি পৃথিবীতে মাত্র ২৩৭ জনের আছে । এই রোগটা প্রাণঘাতীও ছিল না। কিন্তু ক্রেজি বাবা মা তাকে সুস্থ করার আশায় গবেষক জিলং কিউ-এর ওপর ভরসা করে এই বিপজ্জনক পথে পা বাড়ান।
বেইস এডিটিং করে সেই গবেষক চেয়েছিলেন তার সেই মিউটেশন কারেক্ট করতে। যেমন- যদি আমাদের DNA তে যদি কোন জিনে এক যায়গায় C থাকার জন্য অস্বাভাবিক কাজ করে তবে সেটি সরিয়ে এতে অন্য কোন বেইস যেমন G বসিয়ে দেয়া হলে স্বাভাবিক কাজ করবে সেই জিন।
অবাক হবেন জেনে যে বাবা-মা নিজেদের ও আত্মীয়স্বজনের জমানো প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার এই চিকিৎসায় খরচ করেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার যায় সরাসরি সেই গবেষকের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে, আর সাথে আইফোন, আইপ্যাড ও দামি উপহারও দেন।
যেমনটা বলেছি মানবদেহে প্রয়োগের আগে থেরাপিটি বানরের ওপর পরীক্ষা করা হয়েছিল। ইনফিউশনের মাত্র এক মাস আগে শেষ হওয়া সেই পরীক্ষায় দেখা যায় চিকিৎসা পাওয়া চারটি বানরেরই মাঝারি থেকে তীব্র লিভারের ক্ষতি হয়েছে, একটির কিডনিও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। গবেষক ফলাফলটি বাবা-মাকে জানালেও বাবা মা গুরুত্ব দেন নি। আর হাসপাতালের এথিকস কমিটি সেই চূড়ান্ত রিপোর্টটি না পড়েই ট্রায়ালের অনুমোদন দেয়।
চীনের চিকিৎসা কাঠামোর আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে ট্রায়ালটি জাতীয় ঔষধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়াই কেবল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে শুরু করা হয়।
মাত্র সাত দিনের মাথায় ভয়ংকর ইমিউন প্রতিক্রিয়ায় প্রথমে মেই এর কিডনি ফেইল করে। এরপর লিভার ফেইল করে সে মারা যায়। যে জটিলতায় তার মৃত্যু হলো, সম্মতিপত্রে তার নাম উল্লেখ থাকলেও কোথাও লেখা ছিল না যে এতে শিশুটির মৃত্যু হতে পারে।
সবশেষে, মৃত্যুর পর হাসপাতালকে জরিমানা করা হয় মাত্র ৩,৬০০ ডলারের মতো।।আরো অবাক করা বিষয় হচ্ছে যে কোনো চিকিৎসক বা গবেষকের কোন শাস্তিই হয়নি। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, শিশুটির মৃত্যুর তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রেখে, পরিবারটির সব রেফারেন্স মুছে ফেলে এবং বানরের লিভার-কিডনির সমস্যার কোনো উল্লেখ না করেই গবেষকরা সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ এই থেরাপি নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।
ঠিক প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটে ১৯৯৯ সালে, এমেরিকাতে। সেবার জিন থেরাপির ট্রায়ালে আঠারো বছরের জেসি গেলসিঞ্জারের মৃত্যুর পর বিশ্ববিদ্যালয়কে পাঁচ লাখ ডলারের বেশি জরিমানা করা হয়, গবেষণা কার্যক্রম স্থগিত হয়, প্রধান গবেষককে পাঁচ বছরের জন্য মানবগবেষণা থেকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং গোটা বায়োমেডিকেল সায়েন্সে এমন সমালোচনা শুরু হয় যা পরবর্তীতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য রুলস রেগুলেশনগুলো কড়াকড়ি করা হয়।
মানুষের জীবন বাঁচানোই বিজ্ঞানের কাজ। জিন এডিটিং প্রযুক্তি ভবিষ্যতে বহু মানুষের উপকারে আসবে, আর সেই কারণেই এ ঘটনা আরও বেশি বেদনা দায়ক। এই প্রযুক্তি মানুষের আস্থা অর্জন করার বদলে এসব অন্যায় ও দূর্নীতি চিকিৎসার প্রতি মানুষের আগ্রহ ও ফান্ডিং এর পরিবর্তে সন্দেহ ও অবিশ্বাস বাড়াবে।
মেইয়ের বাবা-মা এতদিন পর মুখ খুলেছেন কারণ অভিভাবক গ্রুপের অন্য পরিবারগুলো উনাদের কাছে নিজেদের বাচ্চাদের জন্য জানতে চাইতে শুরু করেছে তারা কিভাবে ওই ল্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
আর এই পুরো ঘটনাটা আজ প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত সায়েন্স ম্যাগাজিনের ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টে। আজ Science ও Retraction Watch যৌথভাবে যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। আর নেচার সেই আর্টিকেলটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
বিজ্ঞানে প্রতারণা কিংবা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে আজকে আপনি হয়তোবা পার পাবেন কিন্তু কাল আপনি ধরা পড়বেনই।
লেখার ক্রেডিট:Ahsan Rahman
Source: science.org
Leave a Reply