
শিক্ষার আলো ছড়ানোর পবিত্র প্রাঙ্গণ আজ আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। মানুষ গড়ার কারিগর হয়েও এক শিক্ষক নেমে গেছেন জল্লাদের ভূমিকায়। সহপাঠীর সঙ্গে সাধারণ কথা বলা এবং প্রাইভেট পড়ার কুপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার জেরে যশোরের অভয়নগরে এক স্কুলছাত্রীকে পৈশাচিক কায়দায় পিটিয়ে রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠেছে এক সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকালে উপজেলার রাজঘাট জাফরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। এই অমানবিক ও নৃশংস ঘটনায় গোটা এলাকায় তীব্র ক্ষোভ, নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
ভুক্তভোগী রাজিয়া সুলতানা (১৪) উপজেলার মোয়াল্লেমতলা গ্রামের মো. রবিউল ইসলামের মেয়ে এবং রাজঘাট জাফরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে বিদ্যালয়ে গিয়ে এক সহপাঠীর সঙ্গে কথা বলাকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ের ধর্ম বিষয়ক সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম রাজিয়াকে লাইব্রেরি কক্ষে ডেকে নেন। এরপর বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে তার ওপর বেধড়ক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়।
ভুক্তভোগী ছাত্রীর পরিবার ও স্বজনদের অভিযোগ, অবুঝ মেয়েটির শরীরে অন্তত ১৭টি বেত্রাঘাত করা হয়েছে। প্রতিটি আঘাতেই তার কোমল শরীর কেটে-ফেটে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিন ধরে অভিযুক্ত শিক্ষক রফিকুল ইসলাম তাকে প্রাইভেট পড়ার জন্য নানামুখী চাপ দিয়ে আসছিলেন। রাজিয়া সেই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় পূর্বপরিকল্পিত আক্রোশ থেকেই এই নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে।
এদিকে পৈশাচিক এই মারধরের পর প্রত্যক্ষদর্শী ও সহপাঠীদের সহায়তায় আহত ছাত্রীকে দ্রুত উদ্ধার করে রাজঘাট বাজারের এক চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে বাড়িতে নিয়ে যান এবং বর্তমানে স্যালাইন দিয়ে তার চিকিৎসা চলছে।
সহপাঠী ও স্থানীয়দের ওপর চলা এই ত্রাসের রাজত্বে ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী। অভয়নগর উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাজঘাট গার্লস স্কুলের সহকারী শিক্ষক মাহবুর রহমান এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, মেয়েটির শরীরে যে নির্যাতনের চিহ্ন দেখা গেছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি ছাত্রীকে ঘরের দরজা বন্ধ করে এভাবে বেধড়ক মারধর করা সম্পূর্ণ অমানবিক ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া জরুরি।
অভিযুক্ত শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি নির্লজ্জের মতো স্বীকার করে বলেন, স্কুলের পরিবেশ নষ্ট করছিল, তাই আমি মেরেছি। তবে কীভাবে পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি তিনি। পরবর্তীতে সাংবাদিকরা এ বিষয়ে আরও প্রশ্ন করলে তিনি সংযোগ কেটে দেন। এমনকি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের বদলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে শিক্ষা প্রশাসন। অভয়নগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাটি শুনেছি। প্রধান শিক্ষককে ফোন করেছিলাম, কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। আগামী রবিবার বিদ্যালয়ে গিয়ে সরেজমিন তদন্ত করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন পৈশাচিক ও নৃশংস ঘটনার পর অভিভাবক ও সচেতন মহল গভীর উৎকণ্ঠায় প্রশ্ন তুলেছেন—শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার বদলে ভয়, আতঙ্ক ও নির্যাতনের প্রতীক হয়ে ওঠেন, তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পবিত্র পরিবেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? স্থানীয় এলাকাবাসী অবিলম্বে অভিযুক্ত শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কঠোর শাস্তি ও স্থায়ী বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন।
Leave a Reply