
সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে টানা তিন মাস মাছ ও অন্যান্য
জলজ সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। প্রতিবছরের মতো এবারও জুন থেকে আগস্ট
পর্যন্ত সুন্দরবনের নদী-খাল ও বনসংলগ্ন জলাশয়ে মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে। তবে
নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে কর্মহীন হয়ে পড়া বননির্ভর নিবন্ধিত জেলেদের জন্য এবারই
প্রথমবারের মতো খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে সরকার। এতে স্বস্তি ফিরেছে
সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হাজারো জেলে পরিবারের মাঝে।
প্রতি বছর প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনের নদী-খাল ও বনসংলগ্ন জলাশয়ে মাছ, কাঁকড়াসহ
বিভিন্ন জলজ সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ থাকে। এ সময় বননির্ভর হাজারো জেলে কর্মহীন হয়ে
পড়েন। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও মৎস্যসম্পদের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে সরকারের
এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলেও জেলেদের জীবিকায় তৈরি হয় সংকট। সেই বাস্তবতা
বিবেচনায় নিয়ে এবার প্রথমবারের মতো নিবন্ধিত বননির্ভর জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তা
চালু করা হয়েছে।
সরকারের এ কর্মসূচির আওতায় সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল নিবন্ধিত জেলেদের মাঝে চাল
বিতরণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সহায়তা জেলে পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত
করার পাশাপাশি জীবিকার তাগিদে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সুন্দরবনে প্রবেশের প্রবণতা
কমাতে সহায়ক হবে।
খাদ্য সহায়তা পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন উপকারভোগী জেলেরা। তারা জানান,
নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরতে না পারায় এতদিন পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম কষ্টে দিন
কাটাতে হতো। সরকারের এ সহযোগিতা তাদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে
শুধুখাদ্য সহায়তা নয়, ভবিষ্যতে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থারও দাবি জানান তারা।
বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “এর আগে
কখনো সুন্দরবননির্ভর জেলেদের জন্য এ ধরনের খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমান
সরকার প্রথমবারের মতো এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরা, খুলনা,
বাগেরহাট ও মোংলা এলাকার মোট ৮ হাজার ২৭১ জন নিবন্ধিত জেলের জন্য ৬ হাজার
৬৬২ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। রামপাল এলাকায় জেলের সংখ্যা তুলনামূলক কম
হওয়ায় সেখানে বরাদ্দও কিছুটা কম রাখা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “সরকার একদিকে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ
করছে, অন্যদিকে বননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কাজ
করছে। ভবিষ্যতেও জেলেদের কল্যাণে সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”
মোংলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়ন) মো. জাহিদুল ইসলাম
বলেন, “সুন্দরবননির্ভর নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বছরে চার দফায়
৮৪ কেজি, ৭০ কেজি, ৫৬ কেজি ও ৩০ কেজি করে চাল প্রদান করা হয়ে থাকে। প্রজনন
মৌসুমে মাছ আহরণ বন্ধ থাকায় সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। খাদ্য
সহায়তা কর্মসূচির ফলে জেলেরা নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে আরও উৎসাহিত হবেন।”
তিনি আরও বলেন, “বন বিভাগ, মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের সমন্বয়ে সুন্দরবনের নদী-খাল
ও বনসংলগ্ন এলাকায় নিয়মিত টহল পরিচালনা করা হচ্ছে। অবৈধভাবে মাছ ও কাঁকড়া
আহরণ রোধে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।”
নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে বন বিভাগ, মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের সমন্বয়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন
নদী-খাল ও বনসংলগ্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান ও টহল পরিচালিত হচ্ছে। অবৈধভাবে
মাছ ও কাঁকড়া আহরণ ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট
কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রজনন মৌসুমে মাছ আহরণ বন্ধ রাখা এবং একই সঙ্গে বননির্ভর
জেলেদের খাদ্য সহায়তা প্রদান এই দুই উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবনের
মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বননির্ভর মানুষের টেকসই জীবন-জীবিকা
নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণভূমিকা রাখবে।
Leave a Reply