
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার কোলা ইউনিয়নের খেদাপাড়ায় ‘ব্র্যাক ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রজেক্ট’-এর দুধ সংগ্রহ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে চরম অব্যবস্থাপনা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় আইনি অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্র্যান্ডের নাম ভাঙিয়ে কোনো প্রকার তোয়াক্কা ছাড়াই পরিচালিত এই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে দেখা যায়, ডেইরি শিল্পের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম সরকারি স্বাস্থ্যবিধি ও নিয়মকানুন এখানে পুরোপুরি উপেক্ষিত। তরল দুধ—যা শিশুখাদ্যের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল—তা প্রক্রিয়াজাতকরণের স্থানটি কোনো স্বাস্থ্যকর কারখানা নয়, বরং নর্দমাসদৃশ এক দুর্গন্ধময় পরিবেশ। দুধ রাখার ঘরের মেঝেজুড়ে স্যাঁতসেঁতে নোংরা পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র ধরা পড়ে ল্যাবরেটরিতে। দুধের গুণগত মান পরীক্ষার মতো স্পর্শকাতর কাজে নিয়োজিত কর্মীদের শরীরে ছিল না কোনো এপ্রোন, হাতে ছিল না সুরক্ষামূলক গ্লাভস। সম্পূর্ণ খালি হাতে ও সাধারণ পোশাকে কাজ করছেন তারা। অধিকন্তু, ল্যাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের এ সংক্রান্ত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা কারিগরি দক্ষতার সনদপত্র নেই। ফলে মাননিয়ন্ত্রণের নামে এখানে যা চলছে, তা সাধারণ ভোক্তাদের সঙ্গে এক ধরণের প্রবঞ্চনা বৈ কিছু নয়।
স্বাস্থ্যবিধির ভয়াবহ চিত্র ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির আইনি ভিত্তি নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন। অনুসন্ধানকালে ব্র্যাক ডেইরির এই সেন্টার পরিচালনার জন্য অত্যাবশ্যকীয় কারখানা লাইসেন্স, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের মতো মৌলিক কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তরল দুধে দ্রুত ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়। যে নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে এখানে দুধ সংগৃহীত হচ্ছে, তাতে মারাত্মক বিষক্রিয়া ও জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়। এভাবে একটি বড় প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে স্থানীয়দের প্রতারিত করা এবং জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
এলাকাবাসীর পক্ষে স্থানীয় প্রবীণ সমাজসেবক ও সচেতন নাগরিকেরা জানান, “আমাদের শিশুদের মুখে আমরা যে দুধ তুলে দিচ্ছি, তার উৎস যদি এমন নর্দমার মতো অপরিচ্ছন্ন হয়, তবে তা বিষপানের শামিল। আমরা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আস্থার জায়গায় বিশ্বাস রাখতে চাই। অনতিবিলম্বে এখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অসাধু চক্রটির মুখোশ উন্মোচন করতে হবে এবং এই অবৈধ সেন্টার সিলগালা করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।”
জনস্বার্থ নিশ্চিত করা ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে এই অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ ডেইরি সেন্টারের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপের জোর দাবি জানিয়েছেন খেদাপাড়ার ভুক্তভোগী বাসিন্দারা।
Leave a Reply