
যশোরে আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া একটি জটিল বিরোধের বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে। মূল ঘটনাটি শুরু হয় পার্টস ব্যবসায়ী বিল্লালের কাছে মাছ ব্যবসায়ী কামাল ফারাজির পাওনা টাকাকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর কামাল ফারাজি ও তাঁর ছেলেরা বিল্লালকে দোকান থেকে ধরে নিয়ে আটকে রাখেন। খবর পেয়ে বিল্লালের আত্মীয় মোঃ আলী জিন্নাহ আড়তে গিয়ে কথা বললে প্রথমে ২২ লাখ টাকা দাবি করা হয়। এর দুদিন পর বিল্লালের দুটি দোকানে তালা মেরে চাবি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠলে কোতোয়ালি মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়। পুলিশ রাতে অভিযান চালিয়ে চাবি উদ্ধার করে বিল্লালকে ফেরত দেয় এবং দুই পক্ষকে থানায় তলব করে।
১৪ অক্টোবর থানায় পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে আয়োজিত বৈঠকে পাওনার অঙ্কে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। জানা যায়, মূল পাওনা ছিল প্রায় ১২ লাখ টাকা, যার সঙ্গে ১০ লাখ টাকা সুদ হিসেবে যোগ করে প্রথমে ২২ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। সমঝোতা বৈঠকে চূড়ান্ত হিসাব দাঁড়িয়েছিল ১৪ লাখ টাকায়। শর্ত দেওয়া হয়, দুই মাসের মধ্যে বিল্লাল তাঁর বাড়ি বিক্রি করে এই টাকা শোধ করবেন এবং এর মধ্যে আলী জিন্নাহকে জামিনদার হতে হবে। জিন্নাহ জামিনদার হতে রাজি হলে তাঁর কাছ থেকে চেক ও স্ট্যাম্প নেওয়া হয়।
তবে ঘটনার মোড় ঘোরে এর কিছুদিন পর, যখন মূল দেনাদার বিল্লাল তাঁর পরিবারসহ এলাকা ছেড়ে উধাও হয়ে যান। তাঁকে খুঁজতে গিয়ে জামিনদার জিন্নাহর আনুমানিক ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। মূল দেনাদার না থাকায় পাওনাদারদের সমস্ত চাপ এসে পড়ে জামিনদার জিন্নাহর ওপর। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি তিনি যশোর পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। বিষয়টি উপশহর পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ অলোক বাবুকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলে তিনি বিবাদী পক্ষকে বেআইনি কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে ঘটনার ভয়াবহতা আরও বৃদ্ধি পায়, যখন অন্য এক ব্যক্তির মাধ্যমে আলী জিন্নাহকে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে বলা হয়, “এই টাকার জন্য আপনি মার্ডার হয়ে যাবেন।”
সমগ্র ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, এটি কেবল একটি সাধারণ আর্থিক দেনা-পাওনার বিষয় নয়, বরং এতে জড়িয়ে আছে সুদের কারবার, জোরপূর্বক দোকানে তালা দেওয়া, জামিনদারের ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি এবং মারাত্মক ফৌজদারি হুমকির মতো বিষয়। প্রারম্ভিক ২২ লাখ টাকা দাবি থেকে ১৪ লাখ টাকায় সমঝোতা, পুলিশি চাবি উদ্ধার অভিযান, জামিননামা হিসেবে চেক-স্ট্যাম্প গ্রহণ এবং পরবর্তীতে দেনাদারের উধাও হয়ে যাওয়ার পর জামিনদারকে হুমকির অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।
যেহেতু এসব তথ্য সম্পূর্ণভাবে আবেদনকারী আলী জিন্নাহর বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে প্রাপ্ত, তাই চূড়ান্ত সত্যতা উন্মোচনে কামাল ফারাজি ও তাঁর পরিবার, মূল দেনাদার বিল্লাল, থানার সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা এবং জামিন সংক্রান্ত নথিপত্রের নিরপেক্ষ যাচাই অত্যন্ত জরুরি। আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত নথি, হুমকির অডিও বা প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং থানার জিডি রেজিস্টার পরীক্ষা করে আইনগত ব্যবস্থার মাধ্যমেই এই জটিল বিরোধের সঠিক বিচার সম্ভব।
Leave a Reply