
জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে ঘাম ঝরিয়ে বিজয়ী হয়েও মিলেনি কাঙ্ক্ষিত পুরষ্কার ও সনদ। শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য সম্মানটুকু পর্যন্ত গিলে খাওয়ার অপচেষ্টায় মেতে উঠেছিলেন ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার সাবেক ভারপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বাকী বিল্লাহ। অনুষ্ঠান শেষের দীর্ঘ সাত মাস পার হলেও বিজয়ী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হাতে পুরষ্কার না উঠায় চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পুরষ্কারের অর্থ আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর খবর ফাঁস এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে তড়িঘড়ি করে পুরষ্কার কেনার নাটক সাজিয়েছেন অভিযুক্ত ওই শিক্ষা কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছরের মতো চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেও কোটচাঁদপুরে আয়োজিত হয় ‘জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২০২৬’। এতে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীরা ২৫টি ইভেন্টে অংশ নিয়ে মেধা ও ক্রীড়ানৈপুণ্য প্রদর্শন করে বিজয়ী হন। প্রতিযোগিতা শেষে জেলা, বিভাগ এমনকি জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলেও কোটচাঁদপুরের বিজয়ীদের কপালে জোটেনি কোনো সম্মাননা।
অভিযোগ উঠেছে, গত ১ এপ্রিলেই পুরষ্কার ক্রয়ের নামে ৭৫ হাজার ৫০০ টাকার ভুয়া বিল-ভাউচার বানিয়ে পুরো অর্থ পকেটস্থ করেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বাকী বিল্লাহ (বর্তমানে শৈলকুপা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা)। বরাদ্দ না পাওয়ার অজুহাত দিয়ে দীর্ঘ সাত মাস ধরে শিক্ষার্থীদের পাওনা পুরষ্কার আটকে রাখেন তিনি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—বরাদ্দ আসার পরই মূলত বিল তুলে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পুরষ্কার না কিনে পুরো টাকাই আত্মসাৎ করার পাঁয়তারা চালান তিনি। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে এবং জাতীয়তাবাদী নাগরিক অধিকার সুরক্ষা কেন্দ্র (এনসিপি) সহ স্থানীয় সুশীল সমাজ প্রতিবাদ জানালে বাধ্য হয়ে গত ২৫ আগস্ট কিছু পুরষ্কার কিনে অফিসে জমা করা হয়।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ক্ষোভের বিষয়ে ঝিনাইদহ-৩ আসনের এনসিপি নেতা হৃদয় আহম্মেদ জানান, “শিক্ষার্থীদের মেধার প্রতি এমন অবহেলা ও অনিয়ম কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বিজয়ী শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করে পুরষ্কারের অর্থ নয়ছয় করার প্রতিবাদেই আমরা সরব হয়েছি।”
অভিযোগের বিষয়ে তৎকালীন অভিযুক্ত কর্মকর্তা বাকী বিল্লাহর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি অর্থ নয়ছয়ের বিষয়টি সরাসরি এড়িয়ে গিয়ে দাবি করেন, “বরাদ্দ পেতে বিলম্ব হওয়ার কারণেই পুরষ্কার দিতে দেরি হয়েছে।”
বর্তমানে সদ্য যোগদানকৃত কোটচাঁদপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নেছার উদ্দিন আহম্মেদ জানান, “আমি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছি। পেছনের ঘটনা পুরোপুরি অবগত নই। তবে গত পরশু কিছু পুরষ্কার অফিসে এসে পৌঁছেছে, যা দ্রুত বিজয়ীদের মাঝে বিতরণ করা হবে।”
শিক্ষা ব্যবস্থার মতো স্পর্শকাতর জায়গায় এমন জালিয়াতি ও স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কোটচাঁদপুর সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মফিজুর রহমানও। তিনি বলেন, “পুরষ্কার সংক্রান্ত সব বিষয় শিক্ষা অফিসের। ইতিপূর্বে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব কখনও দেখা যায়নি।”
শিক্ষা অফিসের এমন দুর্নীতির চিত্র প্রকাশ্যে আসার পর ঝিনাইদহ জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম হোসাইন এ বিষয়ে জানান, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। সত্যতা যাচাইয়ে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মেধাবী কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষা কর্মকর্তার এমন অনৈতিক ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও সচেতন মহল।
Leave a Reply